মোঃ রায়হান হোসেন: আইনের শাসন ও সুবিচারের প্রধান স্তম্ভ পুলিশ প্রশাসন, যার ওপর নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায় বর্তায়। কিন্তু রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ মানুষের যাওয়ার জায়গা থাকে কোথায়? সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানা বর্তমানে এমনই এক ভয়ংকর আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
খোদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছাবেদ আলী এবং উপ-পরিদর্শক (এসআই) শংকর চন্দ্র দেবের বিরুদ্ধে নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, সীমাহীন ঘুষ বাণিজ্য, রাজনৈতিক আঁতাত এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এসব খামখেয়ালিপনা ও স্বেচ্ছাচারিতার বিচার চেয়ে গত ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে সিলেটের পুলিশ সুপার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন সিলেট জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির সদস্য ও যুবদল নেতা মো. সুমন আহমদ সুজা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওসি মো. ছাবেদ আলী যোগদানের পর থেকেই গোলাপগঞ্জ থানাকে একটি দুর্নীতির কারখানায় পরিণত করেছেন। টাকার বিনিময়ে নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো বানোয়াট মামলায় ফাঁসিয়ে আদালতে চালান করা হচ্ছে।
এর অন্যতম সহযোগী হিসেবে কুশিয়ারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই শংকর চন্দ্র দেবের নাম উঠে এসেছে। গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে (মামলা নং-১৭) বিদেশফেরত জাহিদুল ইসলামকে ফাঁসাতে এক নারী দেহ ব্যবসায়ীর সাথে যোগসাজশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মিথ্যা মামলা সাজান এসআই শংকর ও ফাতা-ইব্রাহিম মিয়া চক্র। পরবর্তীতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শংকর আসামির কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জাহিদুলকে সোজা কারাগারে পাঠানো হয়।
অভিযোগপত্রে ওসি ছাবেদ আলীর রাজনৈতিক দ্বিমুখী নীতির এক ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তিনি নিজেকে জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিলেও স্থানীয় জামায়াত নেতাদের ইশারায় সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ কৃষক লীগের গোলাপগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্তত ৫টি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও ওসি তাকে গ্রেপ্তার করছেন না। উল্টো ওসির ছত্রছায়ায় মালেক সুরমা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা বারবার তাগিদ দিলেও ওসি ছাবেদ আলী এই অপরাধীকে রক্ষায় মরিয়া।
গোলাপগঞ্জ থানার ওসির রুটিন যেন কোনো অপরাধজগতের মহারাজার মতো। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সারারাত ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে আড্ডা, দাওয়াত ও ফুর্তিতে মত্ত থাকেন। ভোররাতে ঘুমানোর পর তার দিনের শুরু হয় দুপুরে বা বিকেলে। শীর্ষ কর্মকর্তার এমন দায়িত্বহীনতার মাশুল গুনতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। আসামীদের আদালতে চালান দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা হয় বিকেল ৫টার পর। এই চরম গাফিলতির কারণে আসামিরা সময়মতো আইনি লড়াই বা জামিন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না, যা একজন নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গোলাপগঞ্জ থানায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র শিউরে ওঠার মতো। কাউকে আটকের পর তার পরিবারকে কোনো তথ্য না দিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রাখা হয়। থানা হাজতে বন্দীদের খাবারের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ থাকলেও তা লোপাট করা হচ্ছে। আসামীদের ন্যূনতম খাবার দেওয়া হয় না, বাধ্য হয়ে স্বজনদের বাইরে থেকে খাবার আনতে হয়। হাজতখানা ও টয়লেটের পরিবেশ এতোটাই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর যে, অসহনীয় দুর্গন্ধের কারণে বন্দীরা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। প্রতি বছর থানার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আসা বিপুল অঙ্কের সরকারি বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
থানা হাজতে শোয়ার জায়গার সংকট, পুলিশ সদস্যদের অমানবিক আচরণ এবং রুটিন কাজে ওসির এই ফাঁকিবাজি আজ দেশের পুলিশ প্রশাসনের একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল অনতিবিলম্বে গোলাপগঞ্জ থানার এই অমানবিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং ওসি মো. ছাবেদ আলী ও এসআই শংকর চন্দ্র দেবের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অন্যথায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।